country
BN
লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জে সাতক্ষীরায় নতুন সম্ভাবনা দেশি পাট-৮
[]
jagonews24.com | rss Feed
অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টিপাত ও রোগবালাইয়ের প্রকোপ কম থাকায় চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় পাটের ভালো ফলন হয়েছে। জেলার বিভিন্ন বিল, খাল ও জলাশয়ে এখন চলছে পাট পচানো বা ‘জাক দেওয়ার’ কাজ। তবে উৎপাদন ভালো হলেও বাড়তি খরচ, ন্যায্যমূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং উপকূলীয় এলাকায় ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষকরা।
এ অবস্থায় লবণসহিষ্ণু দেশি পাট-৮ জাতকে উপকূলীয় সাতক্ষীরায় পাট চাষের নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, লবণাক্ততা সহ্য করতে সক্ষম এ জাতটি উপকূলের একফসলি ও পতিত জমিতে সম্প্রসারণ করা গেলে পাট চাষের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার সাত উপজেলায় মোট ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে জেলায় উৎপাদিত পাটের মোট বাজারমূল্য ২০০ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, সাতক্ষীরা সদরে ৫ হাজার ২০ হেক্টর, কলারোয়ায় ৩ হাজার ২৫৫ হেক্টর, তালায় ৩ হাজার ১১০ হেক্টর, দেবহাটায় ২০ হেক্টর, কালীগঞ্জে ১০১ হেক্টর, আশাশুনিতে ৯৫ হেক্টর এবং শ্যামনগরে ৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।
কৃষকরা জানান, অন্যান্য বছর এ সময় পাটে ছত্রাকজনিত গোড়াপচা, পাতা শুকিয়ে যাওয়া এবং বিছা পোকার আক্রমণ দেখা দিলেও এবার রোগবালাই তুলনামূলক কম ছিল।
তালা উপজেলার ইসলামকাটি ইউনিয়নের কৃষক আকবার আলি বলেছেন, আগের বছরগুলোতে রোগবালাই দমনে বারবার কীটনাশক ও ওষুধ ব্যবহার করতে হতো। এবার পরিস্থিতি ভালো থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে।
তার দাবি, এক বিঘা জমিতে পাট চাষে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বাজার দর অনুকূলে থাকলে বিঘা প্রতি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার পাট বিক্রির আশা করছেন তিনি।
একই উপজেলার কুমিরাগ্রামের কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেছেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শের পাশাপাশি সরকারি প্রণোদনার আওতায় বীজ ও সার পাওয়ায় আবাদে সুবিধা হয়েছে। রোগবালাই কম থাকায় গাছও ভালো হয়েছে।
তবে সব কৃষকের উৎপাদন খরচ এক নয়। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আকড়াখোলা গ্রামের কৃষক হোসেন আলী জানান, সার ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় এবার তার বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ থেকে ২০ হাজার টাকা। গত বছর একই জমিতে এ খরচ ছিল ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। ফলে উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততা সাতক্ষীরার পাট চাষে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানি প্রবেশ, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে অনেক স্থানে পাট বীজের অঙ্কুরোদ্গম ব্যাহত হচ্ছে। এতে দেশের অন্য অঞ্চলের ফলন আগে ঘরে উঠলেও এই অঞ্চলের কৃষকরা দেরিতে ফসল পাচ্ছেন। যার ফলে গত তিন বছরে সাতক্ষীরা জেলায় পাটের আবাদ কমেছে প্রায় ১ হাজার ২১০ হেক্টর।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) উদ্ভাবিত লবণসহিষ্ণু দেশি পাট-৮ জাতকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, উপকূলের একফসলি ও পতিত জমিতে এ জাতের পাট চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ বাড়তে পারে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আগেই শুষ্ক মৌসুমে স্বাদু পানি ব্যবহার করে জমি প্রস্তুত করে আগাম বীজ বপন করা গেলে অঙ্কুরোদ্গম বাড়ানো সম্ভব।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। লবণসহিষ্ণু নতুন জাতের পাট জনপ্রিয় করতে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, কৃষক প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবসের আয়োজনও করা হচ্ছে। উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, সরকারি সহায়তা এবং পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে উপকূলীয় সাতক্ষীরায় পাট চাষের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
আহসানুর রহমান রাজীব/কেএইচকে/জেআইএম