country
BN
সার সিন্ডিকেটের পকেটবন্দি প্রশাসন?
[]
jagonews24.com | rss Feed
সরকারি গুদামের সার প্রকাশ্যে খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে- এমন অভিযোগ পেয়ে প্রশাসনকে জানানো হলো। ঘটনাস্থলে এসে অভিযান চালানোর অনুরোধও করা হলো প্রশাসনকে। প্রশাসন আসবে, এমন আশ্বাসে সাংবাদিকরা অপেক্ষা করলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কিন্তু চার ঘণ্টা অপেক্ষার পরও এলো না প্রশাসন!
ফলে যেসব দোকানে শত শত বস্তা সরকারি সার পাওয়া গেছে, সেসব সার যথাযথ বরাদ্দ ও বৈধ কাগজপত্রে সেখানে এসেছে কি না সেটিও রয়ে গেল অজানা। ঘটনাটি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের ফেরসাডাঙ্গী বাজারের।
শুধু মোহাম্মদপুর নয়, পরবর্তীতে নারগুন ও শীবগঞ্জ বাজারের কয়েকটি দোকানেও পাওয়া যায় একই ধরনের সরকারি সারের বস্তা। প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হলেও সেখানেও চালানো হয়নি কার্যকর কোনো অভিযান। ফলে জানা গেল না খোলা বাজারে কীভাবে এল এই শত শত বস্তা সরকারি সার।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি সার যদি খোলাবাজারের দোকানে শত শত বস্তায় পাওয়া যায়, তাহলে প্রশাসনের দায়িত্ব কোথায়? সার সিন্ডিকেটের পকেটবন্দি হয়ে গেছে কি প্রশাসনের দায়িত্ববোধ? নাকি এই সিন্ডিকেট প্রশাসনের চেয়েও শক্তিশালী? আর অভিযোগ পাওয়ার পরও যদি প্রশাসন ঘটনাস্থলে না যায়, তাহলে কার স্বার্থে এই নীরবতা?
আরও পড়ুন
সার ডিলার সংক্রান্ত সংশোধিত নীতিমালা প্রকাশ
সারের জন্য হাহাকার
সারের জন্য কৃষকের হাহাকার। কৃষকের অভিযোগের শেষ নেই। কেউ প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরছেন। আবার কেউ সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে খোলাবাজারে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এমন অভিযোগও রয়েছে।
কিন্তু এর বিপরীত চিত্র দেখা গেল মোহাম্মদপুর বাজারে। ডিলারের কাছে যে সার পাওয়ার কথা, সেই সরকারি সারের বস্তাই পাওয়া গেল বিভিন্ন দোকানে।
প্রশ্ন হলো- কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার বাজারের দোকানে গেল কীভাবে? কোন গুদাম থেকে বের হয়েছে এসব সার? কার বরাদ্দ ছিল? কোন ডিলারের মাধ্যমে গেছে? দোকানির কাছে কি বৈধ চালান আছে? সরকারি হিসাবের সঙ্গে কি এসব সারের মজুদ মিলিয়ে দেখা হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করতে হলে প্রয়োজন ছিল তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক অভিযান ও তদন্ত।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তার উল্টো চিত্র। অভিযোগ পেয়েও কেন নীরব প্রশাসন?
মোহাম্মদপুর বাজারে সরকারি সার পাওয়ার তথ্য প্রশাসনকে জানানো হয়। সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করে প্রশাসনকে অনুরোধ করেন এসে সারগুলো পরীক্ষা করুন, কাগজপত্র যাচাই করুন এবং অনিয়ম থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নিন। প্রশাসন আসবে, এই আশ্বাসে সাংবাদিকরা অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি। চার ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অভিযান না আসার ঘটনা এখন আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ঘটনাস্থল থেকে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল ইসলামকে অবহিত করলে তিনি বলেন, ‘আমি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে বলে দিচ্ছি তিনি বিষয়টি দেখবেন।’
আরও পড়ুন
সার কিনতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা, মহাসড়কে কৃষকদের বিক্ষোভ
কিছুক্ষণ পর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাসিরুল আলমকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি বলেন, ‘ওই ইউনিয়নের উপ-সহকারীকে ঘটনাস্থলে দ্রুত যেতে বলছি। আপনারা অপেক্ষা করেন।’
পরে মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের উপ-সহকারী নাফিসা বানুর সঙ্গে একাধিক বার কথা হলেও ঘটনাস্থলে তিনি আসেননি।
পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন দিলে কেউ রিসিভ করেননি।
ক্ষুব্ধ কৃষকরা
কৃষকদের অভিযোগ, তাদের প্রাপ্য সার নানা পথে খোলাবাজারে চলে যাচ্ছে এবং সেখানে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকদের সার না দিয়ে বড় বড় খুঁচরা ব্যবসায়ীদের সার দেওয়া হচ্ছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রয়োজন প্রশাসনিক তদন্ত। কিন্তু অভিযোগের পরও যদি প্রশাসন ঘটনাস্থলে না যায়, তাহলে সেই নীরবতাই কি সিন্ডিকেটকে আরও বেপরোয়া করে তুলছে না?
কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা যদি অপরাধীদের সাহস জোগায়, তাহলে সেই নিষ্ক্রিয়তার দায় কে নেবে? প্রশাসনের কাছে সরকারি সারের প্রতিটি বস্তার হিসাব থাকার কথা। গুদাম থেকে বের হওয়ার পর কোন ডিলার কত সার পেলেন, কোথায় গেল, কত বিক্রি হলো সবকিছুর হিসাব থাকার কথা। তাহলে খোলা বাজারের দোকানে শত শত সরকারি সারের বস্তা পাওয়া গেলে সেই হিসাব কেন মিলিয়ে দেখা হবে না?
কৃষক ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কৃষক সার না পেলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে। ফসল উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে।
অথচ সেই সংকটের মধ্যেই যদি সরকারি সার খোলাবাজারে পাওয়া যায় এবং অভিযোগ জানানোর পরও প্রশাসন ঘটনাস্থলে না যায়, তাহলে এটি আর নিছক সার সংকটের বিষয় থাকে না। এটি হয়ে ওঠে সরকারি ব্যবস্থাপনা, নজরদারি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন।
কৃষি অফিসের তথ্য মতে, জেলায় কোনো সার সংকট থাকার কথা নয়। চাহিদা অনুযায়ী সারের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সারের যে সংকটের কথা শোনা যাচ্ছে এটি সিন্ডিকেট চক্রের সৃষ্ট কৃত্রিম সংকট।
আরও পড়ুন
রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন এমওপি সার কিনবে সরকার
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, সরকার অনেক টাকা ভর্তুকি দিয়ে কৃষির উৎপাদন ঠিক রাখতে কৃষক পর্যায়ে সার দিচ্ছে। এক কেজি ইউরিয়া ৭৫ টাকায় কিনে কৃষককে ২৭ টাকায় দিচ্ছে। এক কেজি ডিএপি ১০৫ টাকায় কিনে সেটি ২১ টাকায় দিচ্ছে। কিন্তু সরকারের এই চেষ্টাকে বিফল করতে সিন্ডিকেট চক্র কাজ করছে। যে সার আমরা পেয়েছি তা দিয়ে সংকট হওয়ার কথা নয়।
সার বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, সারের কোনো সংকট নেই। যারা সংকট তৈরি করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এফএ/এএসএম