মঙ্গলবার (১১ আগস্ট), বিকেল আনুমানিক ৩টা। রাজধানীর আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানের দক্ষিণ পাশের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন এক দম্পতি ও তাদের ছোট শিশুকন্যা। ফটকের পাশের কবরস্থান কার্যালয়ে মোহরার রবিউল ইসলামের কক্ষের জানালার সামনে এসে দাঁড়ান তারা। লুঙ্গি ও ময়লা শার্ট পরা বাবা দুই হাতে সেলাই করা ছোট একটি কাঁথায় মোড়ানো নবজাতকের নিথর দেহ বুকে ধরে ছিলেন। ক্লান্তি আর শোকে তার চোখেমুখে ছিল বিষণ্নতার ছাপ। পাশে কালো বোরকা পরা নারী নীরবে কাঁদছিলেন। আনুমানিক তিন-চার বছরের শিশুটি কিছুই বুঝতে না পেরে কখনো বাবার দিকে, কখনো মায়ের দিকে তাকাচ্ছিল। রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে নবজাতকের নিথর দেহ নিয়ে দাফনের অপেক্ষায় বাবা-মা কিছুক্ষণ পর নবজাতকের দাফনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে মোহরার রবিউল ইসলামের কাছে জানতে চান ওই ব্যক্তি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত এ প্রতিবেদক নবজাতকটির মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার মা মরিয়ম বলেন, ‘ওরা আমার বাচ্চাটাকে মেরে ফেলেছে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা দেয়নি। দেরিতে চিকিৎসার ফলে অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউ ফাঁকা নেই বলে জানায়। পরে এক দালাল একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে ভর্তি করে। সেখানে নবজাতকের মৃত্যু হলে কয়েক ঘণ্টায়ই ৪৮ হাজার টাকা বিল করা হয়। পরে কান্নাকাটি করে ১৮ হাজার টাকা বিল দিয়ে লাশ নিয়ে দাফন করতে এসেছি।’ বিস্তারিত জানতে চাইলে মৃত নবজাতকের বাবা মো. সোহেল বলেন, আমাদের বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়ায়। বর্তমানে আমি নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে বসবাস করি। গত ৮ আগস্ট দিনগত রাত ১টার দিকে (৯ আগস্ট) স্ত্রীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা খারাপ থাকলেও চিকিৎসকরা স্বাভাবিক প্রসবের জন্য অপেক্ষা করতে বলেন। আরও পড়ুন ঢামেক থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, দুই দালাল আটক মরিয়ম বলেন, ‘হাসপাতালে আসার সময় বাচ্চা সুস্থ ছিল, নড়াচড়াও করছিল। আমি চিকিৎসকদের বারবার জানিয়েছি। কিন্তু তারা সময়মতো চিকিৎসা শুরু করেননি। এমনকি বাচ্চা প্রসবের পরও তাদের ডেকে পাইনি। দেরিতে প্রসব হওয়ায় জন্মের পর বাচ্চাটি কান্নাও করেনি।’ তিনি বলেন, জন্মের পর নবজাতক কান্না না করায় বাচ্চার শরীরে একটি মোটা পাইপ প্রবেশ করানো হয়। এরপরও কোনো সাড়া না পাওয়ায় চিকিৎসকরা নবজাতককে আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজনের কথা জানান। তবে ওই সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) কোনো শয্যা খালি নেই বলে জানানো হয়। পরে তারা সেখানকার এক দালালের খপ্পরে পড়ে পান্থপথে বিএসিসি ডব্লিউ অ্যান্ড সিএইচ নামে একটি হাসপাতালের এনআইসিইউতে নবজাতককে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নবজাতকের মৃত্যু হয়। আরও পড়ুন ঢামেক পরিচালকের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে চিকিৎসকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে মরিয়ম বলেন, একদিনেই ৪৮ হাজার টাকা বিল করা হয়। ‘আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা কোথায় পাবো’ জানিয়ে কান্নাকাটি করলে শেষ পর্যন্ত ১৮ হাজার ৬১০ টাকা বিল করে নবজাতকের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার রবিউল ইসলাম বলেন, আজিমপুর কবরস্থানে নবজাতকের মরদেহ দাফনের সুব্যবস্থা রয়েছে। তবে নবজাতকের মা-বাবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কোন ওয়ার্ডে বা কোন চিকিৎসকের অধীনে ভর্তি ছিলেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। চিকিৎসায় আদৌ কোনো গাফিলতি ছিল কি না সে বিষয়েও তারা বিস্তারিত তথ্য না দেওয়ায় এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। আরও পড়ুন গভীর রাতে অসুস্থ, বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা মিললো ঢামেকে নবজাতকটির পৃথিবীর আলো দেখার কথা ছিল আনন্দ আর হাসিতে। বাবা-মায়ের কোলজুড়ে তার বেড়ে ওঠার কথা ছিল। অথচ সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই জন্মের পরপরই তার শেষ ঠিকানা হলো আজিমপুর কবরস্থানের ঠান্ডা মাটি। কবরস্থানের লোহার গরাদের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা-মায়ের কান্না শুধু একটি শিশুকে হারানোর বেদনা নয়, একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবা, সংকটাপন্ন নবজাতকের জন্য আইসিইউ সুবিধা এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে নানা প্রশ্নও সামনে আনে। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর কি কখনো মিলবে? এমইউ/এমএএইচ/